সোমবার ,   ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ,   ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ,  ৯ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি
Cnbnews

জনকল্যাণ ও উন্নয়নে ব্যয়

Print Friendly, PDF & Email

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে স্বর্ণালি মুহূর্ত অতিক্রম করছিল ২০২০ সালে করোনা মহামারী প্রকোপ আসার আগ পর্যন্ত, যা ২০১৯ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার থেকেই প্রতীয়মান হয়। তবে করোনাকালীন সময়েও বাংলাদেশ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও দুর্যোগ সহনশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল করোনার মধ্যেও যেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা ফেরত আসছে, সেই সময় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব ধরনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ২০২১ সালের শেষের দিকে রিজার্ভের পরিমাণ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, দেশের জন্য যা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক।

তবে একটি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, রিজার্ভের বিষয়টি অনেক আগে থেকেই একটি সাধারণ বিষয় হলেও এই বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয় রেকর্ড পরিমাণ অর্জনের পর থেকেই। ইতোপূর্বে রিজার্ভ নিয়ে এমন চুলচেরা বিশ্লেষণ, ভবিষ্যদ্বাণী, সন্দেহ প্রবণতা এতটা পরিলক্ষিত হয়নি।
রিজার্ভ নিঃসন্দেহে একটি দেশের অর্থনীতির মাপকাঠির অন্যতম সূচক, যার সাহায্যে একটি দেশ তার আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ প্রভৃতি আনুষঙ্গিক ব্যয় মিটিয়ে থাকে। বাংলাদেশে রিজার্ভের পরিমাণ মূলত নির্ভর করে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ওপর। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে রিজার্ভ ব্যবহার করে ফুরিয়ে ফেলা যতটা সহজ, বৃদ্ধি করা ততটাই কঠিন। সেই কঠিন কাজটি বাস্তবে পরিণত হলে রিজার্ভের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু, সেই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু যেন হয়ে উঠেছিল রিজার্ভ নিয়ে নৈরাশ্যকর ভবিষ্যদ্বাণী। বাংলাদেশে গত বছরের তুলনায় রিজার্ভের পরিমাণ কমেছে এবং কমার পিছনে সবচেয়ে বড় দায়ভার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের ওপরই বর্তায়। কেননা, করোনা মহামারী ও ইউক্রেনে-রাশিয়া যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছিল ঈর্ষণীয়। সেই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে।
করোনাভাইরাসের কারণে যোগাযোগ, যাতায়াত, আমদানি থেকে শুরু করে সবই প্রায় বন্ধ ছিল। আর যখনই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত হয়, তখন আমদানি করা, পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থের বাড়তি জোগানও রিজার্ভ থেকেই দিতে হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের মতো বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন প্রদান এবং করোনা টেস্টের ব্যবস্থা যেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও করতে পারেনি। যখন করোনা শেষ হয়ে যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, ইন্ডাস্ট্রি তৈরির ক্ষেত্রে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে, এমনকি চাষবাসের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনে নিয়ে আসা, সেগুলোর জন্য ডলার খরচ করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যে ভ্যাকসিন কিনেছি, ভ্যাকসিন যখন রিসার্চ হচ্ছে, তখনই ১২০০ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে, যাতে যেটাই সফল হয়, বাংলাদেশ আগে নেবে। শুধু ভ্যাকসিন নিলেই তো হয় না, ভ্যাকসিন দিতে সিরিঞ্জ লাগে। প্রয়োজনে বিমানে সহায়তায় বিদেশ থেকে জিনিসপত্র আনতে হয়েছে। এ কাজে টাকা খরচ করতে হয়েছে যা ব্যবহার হয়েছে মানুষের কল্যাণে।
সকল ধরনের সংকট কাটিয়ে, সম্ভাবনার সবুজ সংকেত সত্য প্রমাণিত করে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই শতাব্দীর ভয়ঙ্করতম মহামারী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, স্বাভাবিক চলাফেরা, মানুষের জীবন-জীবিকাকে ভয়াবহ করে তুলে। করোনার সংকটকে উতরানোর মতো অভূতপূর্ব সফলতাও বাংলাদেশ দেখাতে সক্ষম হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬.৯৪% জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে। কিন্তু করোনার চেয়ে আরও বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয় রাশিয়া-ইউক্রেনের অনভিপ্রেত যুদ্ধ, যা ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয়ে এখনো চলমান।

এই যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ব্যবস্থা, বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা খেলার বলি হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলো। বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যাপক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হচ্ছে। সার আমদানির ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ধকল সামলাতে হচ্ছে, সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্যের বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির চাপও সামলাতে হচ্ছে। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভিন্নতাকে প্রাধান্য না দিয়ে প্রাধান্য দিচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে সমুন্নত রাখাকে, সেখানে বাংলাদেশে সরকারের সমালোচনাই যেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। যে কোনো কাজের গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই সেই কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখে।
রিজার্ভের অর্থ পায়রাবন্দর নির্মাণ, খাদ্য ও সার আমদানি এবং মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। রিজার্ভের অর্থ থেকে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। সেখান থেকে অর্থায়ন করা হয়েছেপায়রাবন্দর প্রকল্পে। সামান্য সার্ভিস চার্জে এই টাকা এলে পায়রাবন্দর কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে এবং ঘরের টাকা ঘরেই থাকছে, শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর হয়েছে। এসব গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও প্রাণবন্ত, শক্তিশালী ও উন্নত হবে। এখানে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে এবং এই বন্দরে কয়লার জাহাজ আনার মাধ্যমেই বন্দরের জাহাজ চলাচল শুরু হয়। প্রত্যেক বন্দরের নাব্য রক্ষায় সরকার বন্দরগুলোতে নিজস্ব ড্রেজারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। সরকার ড্রেজিং করে এই নৌপথটাকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায়। পাশাপাশি অসম এবং ভুটান পর্যন্ত এই নৌপথ চালু হতে পারবে।
বাংলাদেশে গত বছরের আগস্ট মাস নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়নের কাছাকাছি থাকলেও এখন সেটি ২৬ বিলিয়নে এসে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় কমেছে। ফলে, বাংলাদেশের সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়ছে, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭.৫৫ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের হিসাবের মোট গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪.৩ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা এবং ঋণ হিসাবে দেওয়া আট বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে নেট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬.৩ বিলিয়ন ডলার।
রিজার্ভের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পূর্ববর্তী সরকারের দিকে যদি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যাবে বিএনপির আমলের শেষে ২০০৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও কম, ৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান সময়ের রিজার্ভ যার প্রায় ১২ গুণ। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন রিজার্ভ ছিল ৬.১ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটিকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। এখন করোনা যখন একটু কমেছে, বিনিয়োগ শুরু হয়েছে, আমদানি বেড়েছে, সে কারণে রিজার্ভ কিছুটা কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। ৭ নভেম্বর ২০২২ দিনের শুরুতে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৫৭৭ কোটি ডলার। ওই দিন রিজার্ভ থেকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১৩৫ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। পাশাপাশি আমদানি দায় মেটাতে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। ফলে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে হয় প্রায় ৩ হাজার ৪৩০ কোটি ডলার।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রতিনিয়ত উঠানামা করে। রিজার্ভ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ। লেনদেনের ভারসাম্য প্রতিকূল হলে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার দায় পরিশোধের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে রিজার্ভ। এটি কোনো দেশের বৈদেশিক দায় পরিশোধের অর্থনৈতিক সক্ষমতারও নির্দেশক। এশিয়ার কিছু উন্নত দেশে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের বেশি উদাহরণ রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকং। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৭/অ ধারায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বৈদেশিক মুদ্রার ধারণ ও ব্যবস্থাপনার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারে কোনো অসুবিধা নেই। যারা নেবে, তারা ডলারেও ফেরত দিতে পারে, টাকায়ও ফেরত দিতে পারে। টাকায় ফেরত দিলেও সমস্যা নেই, কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক তো টাকা দিয়েই ডলার কেনে। আমাদের মনে রাখা দরকার, বৈদেশিক মুদ্রা যখন সহজলভ্য হয়ে ওঠে তখন লুটেরা শ্রেণি সুযোগ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এটা বন্ধের জন্য সরকারি কেনাকাটার স্বচ্ছতা, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে কঠোরতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত, আমদানি-রপ্তানিতে সতর্কতা ও নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার পুনর্মূল্যায়নের দরকার আছে।

লেখক : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

Related posts

“”””মানুষ””””

Bablu Hasan

পাইপ লাইনে জ্বালানি সরবরাহের যুগান্তকারী পদক্ষেপ

Bablu Hasan

পার্টটাইম জব

Bablu Hasan